কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজ। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত অধ্যক্ষের সংকটে ভুগছে। প্রায় দুই দশক ধরে অধ্যক্ষ নিয়োগ ও দায়িত্ব পালন নিয়ে জটিলতা, পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীর ঘাটতিতে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে কলেজটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন।
যেভাবে যাত্রা শুরু
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়নের সহিলাটি গ্রামে সুতী নদীর তীরে ১৯৯২ সালে তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সহিলাটি গ্রামের বিদ্যোৎসাহী, শিক্ষানুরাগী ও দানশীল ব্যক্তিবর্গের ৫ দশমিক ০৮ একর ভূমি দানের মাধ্যমে এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রচেষ্টায় কলেজটি প্রতিষ্ঠা পায়। এতে পৃষ্ঠপোষকতা করেন তৎকালীন তাড়াইল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসরাত উদ্দিন আহম্মদ বাবুল।
প্রতিষ্ঠার পর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় পাঠদান শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিএমটি কোর্স চালু করা হয়। পরে ২০১২ সালে বিএ, বিএসএস ও বিবিএস কোর্সের মাধ্যমে ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের স্বীকৃতি অর্জন করে। বর্তমানে কলেজটিতে ২ হাজার ১২০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ৪০.১৭%।
২০১৮ সালের ৮ আগস্টের প্রজ্ঞাপনের আগে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা কলেজ’। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজ’।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে দীর্ঘ পালাবদল
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত এ টি এম মোস্তফা অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেয়াদকে কলেজের অন্যতম ভালো সময় হিসেবে বিবেচনা করেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকেই অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে জটিলতা বাড়তে থাকে।
২০০৭ সালের ২৭ নভেম্বর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান কলেজের শিক্ষক ফারুখ উদ্দিন আহমেদ। তিনি ২০১০ সালের ১৮ মে পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। পরে ২০১০ সালের ১৮ মে থেকে ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত আবারও এ টি এম মোস্তফা দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ১১ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন ফারুখ উদ্দিন আহমেদ। পরে তিনি অবসরে যান।
২০২৩ সালের ১১ জুন থেকে ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন মো. রুহুল আমীন ভূঞা। এরপর দায়িত্ব নেন মো. আতাউর রহমান ভূঞা। কলেজের দায়িত্ব হস্তান্তরসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে একই বছরের ১১ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত। ওই দিন দুপুরেই তিনি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বরের স্মারকে কলেজটির জ্যেষ্ঠতম শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে (ইনডেক্স নম্বর: ৮৫১২৬৫) সাময়িকভাবে আর্থিক ক্ষমতাসহ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন বিষয়ের নন-ক্যাডার সহকারী অধ্যাপক। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর দুপুর থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন।
নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের উদ্যোগেও অগ্রগতি নেই
সরকারিকরণের পর কলেজটির প্রশাসনিক তদারকিতে মাউশির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের উদ্যোগেও তেমন অগ্রগতি নেই। আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সরকারিকরণের পর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে।
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের অধ্যক্ষ হিসেবে বদলিভিত্তিক পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়ন করা হয়। তাঁকে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। তবে অনিবার্য কারণে তিনি এ কলেজে যোগদান করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ফলে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়টি আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে। বর্তমানে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি উপজেলার সহিলাটি গ্রামের বাসিন্দা।
স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন
নিয়মিত অধ্যক্ষ না থাকায় কলেজের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একজন শিক্ষক কিশোরগঞ্জ নিউজকে বলেন, “নিয়মিত অধ্যক্ষ না থাকায় কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।”
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব থাকায় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীর সংকটও প্রকট
কলেজটির সমস্যা শুধু অধ্যক্ষ নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কর্মচারী-সব পর্যায়েই জনবলসংকট রয়েছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় এ সংকটের প্রভাব পড়ছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ৩০টি। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর পদ চারটি এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ তিনটি।
কলেজ সূত্রের হিসাবে, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অবসরে যাওয়ায় মোট সাতটি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক এ বি এম আব্দুল লতিফ স্ট্রোকজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি কলেজে আসতে পারছেন না।
চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত তিনটি কর্মচারী পদের মধ্যে আয়াপদে মোছা. সুলেখা আক্তার পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. জিল্লুর রহমান ফকিরের মৃত্যু এবং মো. জসিম উদ্দিনের অবসরের কারণে দুটি পদ শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে আটজনকে খণ্ডকালীন ভিত্তিতে নিয়োজিত রাখা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষে কলেজে ভর্তির সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অত্যাবশ্যকীয় কর্মচারী বাবদ ৫৫০ টাকা তহবিলে জমা নেওয়া হয়। ওই তহবিল থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের খণ্ডকালীন প্রভাষক মো. আজহারুল ইসলাম, তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজ জামে মসজিদের ইমাম এবং চতুর্থ শ্রেণির ছয়জন খণ্ডকালীন কর্মচারীকে বেতন দেওয়া হচ্ছে।
খণ্ডকালীন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা হলেন- মো. আনজু মিয়া (ইলেকট্রিশিয়ান/দপ্তরি), মো. মেহেদী হাসান রানা (কম্পিউটার অপারেটর/অফিস সহায়ক), মো. হাফিজ শাহ (গেটকিপার), মোছা. হেপি আক্তার (অফিস সহায়ক/আয়া), শাহাজাদ খাঁ (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) ও মো. এশাদ মিয়া (নৈশপ্রহরী)।
কলেজটির সাবেক একজন অধ্যক্ষ কিশোরগঞ্জ নিউজকে বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে মাঝেমধ্যে যেসব অভিযোগ ও আলোচনা শোনা যায়, তাতে এর সুনাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রম ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।”
নিয়মিত অধ্যক্ষ থাকলে কাজের স্বাধীনতা বাড়তো
তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি কিশোরগঞ্জ নিউজকে বলেন, “নিয়মিত অধ্যক্ষ থাকলে অবশ্যই আরও ভালো হতো। এতে কাজের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা বেশি থাকতো। তবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি এবং কলেজের উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করছি।”
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মো. নাজমুল হক কিশোরগঞ্জ নিউজকে বলেন, “কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে পরিচালনা করা উচিত নয়। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব নিয়মিত অধ্যক্ষ পদায়নের জন্য আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করব।”
দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ, শূন্য পদ পূরণ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত কলেজটি আবারও সুশৃঙ্খল ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ফিরে পায়।