মিষ্টি স্বাদের সুস্বাদু ফল পার্সিমন

নূর আলম গন্ধী | কৃষি
সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
মিষ্টি স্বাদের সুস্বাদু ফল পার্সিমন

পার্সিমন জাপানের জাতীয় ফল। জাপানে এ ফলটি `কাকি’ নামে পরিচিত। আমাদের দেশে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে এ ফলের পরীক্ষামূলক চাষ ও উৎপাদন সফল হয়েছে এবং বাংলার মাটিতে অন্যান্য আরো বহু বিদেশি ফলের চাষ সম্প্রসারণের মতোই স্বল্প পরিসরে হলেও ইতোমধ্যে দেশের নানান স্থানে শুরু হয়েছে পার্সিমন ফলের চাষাবাদ ও উৎপাদন।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া পার্সিমন চাষে উপযোগী। বিশ্বের যে সকল দেশে পার্সিমন ফলের উৎপাদন হয় তার মাঝে- চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর আমেরিকা, থাইল্যান্ড, ইসরাইল, নেপাল, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো এবং ভারত উল্লেখযোগ্য।

পার্সিমন মূলত উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এর ইংরেজি নাম Persimon, পরিবার Ebenaceae, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Diospyros kaki। গাব পরিবারের মাঝারি আকারের পত্রঝরা বৃক্ষ। শীতে গাছের সব পাতা ঝরে যায় এবং বসন্তে গাছে নতুন পাতা ধরে।

প্রজাতিভেদে গাছ উচ্চতায় সাধারণত ৮-১০ মিটার উঁচু হয়ে থাকে বা ১৫ থেকে ৫০ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। গাছ অধিক শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট। বাকল রঙে ধূসর। গাছের শাখা-প্রশাখা ও কাঠ শক্ত মানের।

পাতা বড়, রঙে সবুজ, পাতা লম্বায় সাধারণত ১৩-১৪ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ৭-৮ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। ফুল ফোটার মৌসুম বসন্ত। এর পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ধরে আবার কিছু প্রজাতির গাছের বেলায় একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ধরে।

গাছের শাখা-প্রশাখাজুড়ে গুচ্ছাকারে বা একক ভাবে ফল ধরে। ফলের বোঁটা অনেকটাই শক্ত। ফল পাকার মৌসুম আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস এবং এর ব্যাপ্তি থাকে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত।

ফল স্বাদে মিষ্টি ও বেশ সুস্বাদু। ফল আকারে প্রায় গোলাকার, দেখতে গাব বা টমেটো সদৃশ। কাঁচা ফল রঙে সবুজ, জাতভেদে পাকা ফল রঙে হলুদাভ থেকে হলদে রঙের আবার কমলা বা কমলা লাল এবং বাদামি রঙেরও হয়ে থাকে। ফলের উপরের অংশে ঠিক আপেলের মতো মসৃণ খোসা থাকে, তাজা ফল হিসেবে খাওয়ার ক্ষেত্রে খোসা ছাড়িয়ে বা খোসাসহ ফলের পুরু অংশই খাওয়ার উপযোগী।

জাত বৈশিষ্টের ভিন্নতার কারণে ফলের ওজন ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে ফল ওজনে সাধারণত ৭০-৮০ গ্রাম ওজন হয়ে থাকে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৫০ প্রজাতির পার্সিমন উৎপাদিত হয় এবং এর অধিকাংশ জাতই বীজশুন্য। তবে কিছু কিছু প্রজাতির ফল বীজযুক্ত বা ফলে বীজ থাকে। বীজ আকারে লম্বাটে, কিছুটা চ্যাপ্টা, পরিপক্ক বীজ রঙে খয়েরি। বীজ ও কলম চারার মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা হয়। উপযুক্ত পরিবেশে বীজের চরার গাছে ফল ধরতে ৭-৮ বছর সময় লাগে আর অন্যদিকে কলম চারার গাছে দ্রুত সময়ের মাঝে গাছে ফুল-ফল ধরে এবং মাতৃগুণাগুণ বজায় থাকে।

পার্সিমন চাষে জাত নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর তাই বিশ^স্ত নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত আমাদের দেশের বড় বড় নার্সারিগুলো পার্সিমন চাষাবাদের পাশাপাশি বিদেশ থেকে এ ফলের চারা আমদানি করছেন এবং চারা গাছ উৎপাদন ও বিক্রয় করছেন। উন্নত জাতের পার্সিমনের জাতগুলোর মাঝে জাপানিজ, আমেরিকান, মেক্সিকান, অষ্ট্রেলিয়ান, ইন্ডিয়ান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সরাসরি মাটি ও ছাদ বাগানের বড় টবে চাষ উপযোগী। প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মে। তবে পানি নিকাশের উত্তম ব্যবস্থা সম্পন্ন রৌদ্রোজ্জ্বল উঁচু ভূমি ও দো-আঁশ মাটিতে বেশি ভালো জন্মে।

পার্সিমন ফলে বিদ্যমান রয়েছে নানাবিধ পুষ্টি উপাদান। বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের মাঝে- হজমযোগ্য আঁশ, খাদ্যশক্তি, চর্বি, শর্করা, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ফসফরাস, বিটাক্যারোটিন, আয়রন, লৌহ, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, জিংক, নায়াসিন, ম্যাঙ্গানিজ, রিবোফ্লাভিন, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি২, ভিটামিন-বি৬ ও ভিটামিন-সি উল্লেখযোগ্য।

উপকারী দিক বিবেচনায় পার্সিমন- কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও হজমশক্তি বৃদ্ধি করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে, দাঁত ও ত্বক ভালো রাখে, রক্ত স্বল্পতা দূর করে, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে, ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, অকাল বার্ধক্য প্রতিহত করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

পার্সিমন ফলের এ ছবিটি ক্যামেরাবন্দি করি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের কায়স্থপল্লি গ্রামের শাহ্আলমের বসতবাড়ি হতে।

# নূর আলম গন্ধী, উদ্ভিদ-কৃষি ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

কৃষি'র অন্যান্য খবর

সর্বশেষ